Tafsir Fathul Majid

Multiple Ayahs

Tags

Download Links

Tafsir Fathul Majid tafsir for Surah At-Takathur — Ayah 3

أَلۡهَىٰكُمُ ٱلتَّكَاثُرُ ١ حَتَّىٰ زُرۡتُمُ ٱلۡمَقَابِرَ ٢ كـَلَّا سَوۡفَ تَعۡلَمُونَ ٣ ثُمَّ كـَلَّا سَوۡفَ تَعۡلَمُونَ ٤ كـَلَّا لَوۡ تَعۡلَمُونَ عِلۡمَ ٱلۡيَقِينِ ٥ لَتَرَوُنَّ ٱلۡجَحِيمَ ٦ ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيۡنَ ٱلۡيَقِينِ ٧ ثُمَّ لَتُسۡـَٔلُنَّ يَوۡمَئِذٍ عَنِ ٱلنَّعِيمِ ٨

নামকরণ:

التَّكَاثُرُ শব্দটি باب تفاعل এর ক্রিয়ামূল (مصدر), অর্থ আধিক্যতার প্রতিযোগিতা করা, বেশি কামনা করা। এখানে কথাটি ব্যাপক : প্রাচুর্যে ধন-মাল, সন্তান-সন্ততি, সহযোগী, বংশ-গোত্র প্রভৃতি সবই শামিল। প্রত্যেক ঐ বস্তু যার প্রাচুর্য ও আধিক্য মানুষের প্রিয় এবং যা অধিক পাওয়ার প্রচেষ্টা ও কামনা মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার দীন ও আখেরাত হতে উদাসীন করে দেয় তাই এখানে উদ্দেশ্য।

التَّكَاثُرُ শব্দটি এ সূরার প্রথম আয়াতে উল্লেখ আছে, এ থেকেই উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। প্রাচুর্যের লালসা মানুষকে আখিরাত বিমুখ করে রেখেছে, অথচ তাকে অবশ্যই সব কিছু ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমাতে হবে, অতঃপর তাকে দেওয়া সব নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবেÑএ সম্পর্কে সূরায় আলোচনা করা হয়েছে।

يلهي -ألهي অর্থ : গাফেল বা উদাসীন করে দেয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন : দুনিয়ার ভালবাসা ও তার সুখ-সাচ্ছন্দ্য তোমাদেরকে আখিরাতের ব্যাপারে উদাসীন করে ফেলেছে। এমনকি তোমরা মুমূর্ষু অবস্থাতেও দুনিয়ার প্রতি এ লালসায় পড়ে আছো। উবাই বিন কা‘ব (রাঃ) বলেছেন: আমরা-

لو كان لإبن أدم واد من ذهب أحب أن يكون له واديان

অর্থাৎ আদম সন্তানের একটি স্বর্ণের উপত্যকা থাকলে আরেকটি কামনা করবে। এটাকে কুরআনের আয়াত মনে করতাম এমনবস্থায় (أَلْهٰكُمُ التَّكَاثُرُ) সূরাটি অবতীর্ণ হয়। (সহীহ বুখারী, কিতাবুর রিকাক)

আব্দুল্লাহ বিন শিখ্খির (রাঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, আমরা নাবী (সাঃ)-এর নিকট হাজির হলাম। এমন সময় তিনি বললেন :

(أَلْهٰكُمُ التَّكَاثُرُ)

আদম সন্তান বলে : আমার সম্পদ-আমার সম্পদ, অথচ তোমার সম্পদ তো সেটুকুই যা তুমি খেয়েছো এবং পরিধান করে ছিড়ে ফেলেছো অথবা সাদকা করে অবশিষ্ট রেখেছো। (সহীহ মুসলিম হা. ২৯৫৮)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : মৃত ব্যক্তির সাথে তিনটি জিনিস যায়, তার মধ্যে দু’টি ফিরে আসে, শুধু একটি সাথে থেকে যায়। (যে দু’টি জিনিস ফিরে আসে) আত্মীয়-স্বজন ও ধন-সম্পদ। (একটি জিনিস সাথে যায় তা হলো) আমল। (সহীহ বুখারী হা. ৬৫১৪)

বস্তুত অধিক ধনলিপ্সা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির আকাক্সক্ষা মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য এবং আখেরাতের চিন্তা হতে গাফেল রাখে। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ আকাক্সক্ষার শেষ হয় না। আর এটি মানুষের একটি স্বভাবগত প্রবণতা। কাফির-মুশরিকরা এতে ডুবে থাকে। কিন্তু মু’মিন এ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে এবং সর্বদা আখেরাতের জন্য প্রস্তুত থাকে।

(حَتّٰي زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ)

অর্থাৎ যতক্ষণ না তোমাদের মৃত্যু এসে যায়। অতঃপর তোমরা কবরস্থানে পৌঁছে যাও ও তার বাসিন্দা হয়ে যাও। কবরে যাওয়া পর্যন্ত তোমরা দুনিয়াবী প্রাচুর্যের লালসায় লিপ্ত থাক। মানুষের জীবন আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ বছর। অধিকাংশ মান্ষুই এ সময়ের মাঝেই দুনিয়া ছেড়ে চলে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : আমার উম্মাতের আয়ু ৬০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে হবে। খুব কম সংখ্যকই তা অতিক্রম করবে। (তিরমিযী হা. ৩৫৫০, মিশকাত হা. ৫২৮০, সহীহ) এ অল্প সময়ের জীবনের মাঝে শৈশবের দুর্বলতায় চলে যায় ১৫-১৬ বছর, যৌবন কাল মাত্র ১৬-৪০ বছর তারপর আবার বার্ধ্যকের দুর্বলতা চলে আসে। অতঃপর চলে যেতে হয় অনন্ত কালের জন্য আখিরাতে। সুতরাং এ ক্ষণিক সময়ের জন্য মানুষের এত ব্যস্ততা যে, সে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার সময়ও পায় না।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস কর যেন তুমি একজন আগন্তুক অথবা মুসাফীর। (অর্থাৎ মুসাফীর যেমন পথিমধ্যে রাত্রি যাপন করার জন্য কোনরকম একটি তাঁবু তৈরি করে রাত অতিক্রম করেÑ ঠিক সেভাবেই তোমরা দুনিয়াকে মূল্যায়ন কর) (সহীহ বুখারী হা. ৬৪১৬)। অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, তুমি নিজেকে সর্বদা কবরবাসীদের মধ্যে গণ্য কর। (তিরমিযী হা. ২৩৩৩, মিশকাত হা. ৫২৭৪, সহীহ)। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে আখিরাতমুখী হয়ে দুনিয়াতে সচ্ছল জীবন যাপন করার তাওফীক দান করুন।

(كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُوْنَ)

হাসান বাসরী (রহঃ) বলেছেন : এটা ধমকের পর ধমক। অর্থাৎ তোমরা যা করছো তা আদৌ ঠিক নয়। যদি তোমরা জানতে তোমাদের সামনে কী কঠিন অবস্থা অপেক্ষা করছে আর আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া কত নগণ্য তাহলে সৎ কাজের প্রতি ধাবিত হতে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : জান্নাতের একটি চাবুক রাখার স্থান দুনিয়া ও তার মধ্যকার সবকিছুর চাইতে উত্তম। (সহীহ বুখারী হা. ৩২৫০) অন্যত্র তিনি বলেন : সর্বশেষ যে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে তার জন্য দুনিয়া ও তার সমপরিমাণ দশটি দুনিয়ার মত জায়গা জান্নাতে রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান না থাকার কারণে মানুষ দুনিয়ার বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রতি ধাবিত হচ্ছো।

ইলম বা ইয়াকিন (يقين) তিন প্রকার:

(১) حق اليقين এটি তিন প্রকারের সর্বোচ্চ প্রকার। এটা হলো প্রগাঢ় জ্ঞান যা দোদুল্যমান হয়না এবং দূরীভূত হয় না। অথবা এমন জ্ঞান যা আস্বাদন ও সংস্পর্শতার মাধ্যমে অর্জিত হয়।

(২) علم اليقين যে জ্ঞান কোন সংবাদের মাধ্যমে অর্জিত হয়।

(৩) عين اليقين যে জ্ঞান দর্শনের মাধ্যম অর্জিত হয়। (তাফসীর সা‘দী)

এখানে আল্লাহ তা‘আলা علم اليقين ও عين اليقين দুই প্রকার উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ অবশ্য অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করবে। এখানে সাধারণভাবে প্রত্যেক আদম সন্তানকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

(وَإِنْ مِّنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا ج كَانَ عَلٰي رَبِّكَ حَتْمًا مَّقْضِيًّا) ‏

“এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তা (পুলসিরাত) অতিক্রম করবে; এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত‎।” (সূরা মারইয়াম ১৯: ৭১) এখানে পৌঁছানোর অর্থ প্রবেশ করা নয়, বরং অতিক্রম করা। একে পুলসিরাত বলা হয়। হাদীসে এসেছে, মু’মিনগণ পুলসিরাত পার হয়ে জান্নাতে চলে যাবে বিদ্যুতের বেগে, জাহান্নামের কোন উত্তাপ তারা অনুভব করবে না। কিন্তু কাফির-মুশরিকরা তাতে আটকে যাবে এবং জাহান্নামে পতিত হবে। (আহমাদ হা. ২৪৪৭, মিশকাত হা. ৫৭৩৮, সহদ সহীহ) যেমন পরের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

(ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِيْنَ فِيْهَا جِثِيًّا)

“অতঃপর আমি মুত্তাকীদেরকে রক্ষা করব এবং জালিমদেরকে সেথায় নতজানু অবস্থায় রেখে দেব।” (সূরা মারইয়াম ১৯: ৭২)

অতএব মু’মিন-কাফির সবাই জাহান্নামকে প্রত্যক্ষ করবে। মু’মিনগণ সহজে পার হয়ে যাবে। কিন্তু কাফিররা জাহান্নামে পতিত হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সেদিনের কঠিন পাকড়াও থেকে রক্ষা করুন। আমীন!

(لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيْمِ)

অর্থাৎ দুনিয়াতে যত নেয়ামত প্রদান করা হয়েছে সকল নেয়ামত সম্পর্কে আখিরাতে জিজ্ঞাসা করা হবে। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : একদা আবূ বকর (রাঃ) ও উসমান (রাঃ) বসেছিলেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাদের কাছে এসে বললেন : এখানে বসে আছো কেন? উত্তরে তারা বললেন : যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! ক্ষুধা আমাদেরকে ঘর হতে বের করে এনেছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তখন বললেন : যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! ক্ষুধা আমাকেও বের করে এনেছে। তারপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে এক আনসারীর বাড়িতে গেলেন। আনসারী বাড়িতে ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আনসারীর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার স্বামী কোথায়? মহিলা বলল : তিনি আমাদের জন্য মিষ্টি পানি আনার জন্য বাইরে গেছেন। ইতোমধ্যে ঐ আনসারী পানির মশক নিয়ে চলে আসল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও সাহাবীদের দেখে আনসারী আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন। তিনি বললেন : আমার বাড়িতে আজ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাশরীফ এনেছেন, সুতরাং আমার মত ভাগ্যবান আর কেউ নেই। পানির মশক ঝুলিয়ে রেখে আনসারী বাগানে গিয়ে তাজাতাজা খেজুরের কাঁদি নিয়ে আসলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন : বেছে বেছে আনলেই তো হতো। আনসারী বললেন : ভাবলাম যে, আপনি পছন্দ মত বাছাই করে গ্রহণ করবেন। তারপর আনসারী একটি ছুরি হাতে নিলেন (মেষ যবাই করার জন্য)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন : দেখো, দুগ্ধবতী মেষ জবাই করো না। অতঃপর আনসারী তাদের জন্য একটি মেষ জবাই করলেন এবং তাঁরা সেখানে আহার করলেন। তারপর সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন : দেখো তোমরা ক্ষুধার্ত অবস্থায় তোমাদের ঘর থেকে বেরিয়েছিলে অথচ এখন পেট পূর্ণ করে ফিরে যাচ্ছো। এ নেয়ামত সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। (সহীহ মুসলিম, পানি অধ্যায়, হা. ১৪০)

নাবী (সাঃ) বলেন : কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন : হে আদম সন্তান! আমি তোমাকে ঘোড়ায় ও উটে আরোহণ করিয়েছিলাম, নারীদের সাথে বিয়ে দিয়েছি, তোমাকে হাসি-খুশিভাবে আনন্দ-উজ্জ্বল জীবন যাপনের সুযোগ দিয়েছি। এবার বল : এগুলোর শুকরিয়া কোথায়? (আহমাদ ২/৪৯২, সনদ সহীহ)

এছাড়াও এ ব্যাপারে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। সুতরাং আমরা আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত প্রত্যেক নেয়ামতের যথার্থ ব্যবহার করব এবং তাঁর শুকরিয়া আদায় করব।

সূরা হতে শিক্ষণীয় বিষয়:

১. আখিরাতকে ভুলে দুনিয়া ও তার চাকচিক্য নিয়ে ব্যস্ত থাকা নিন্দনীয়।

২. কবর জীবনের প্রমাণ পেলাম।

৩. মানুষ বৃদ্ধ হয়ে যায় কিন্তু দুনিয়ার প্রতি তার আশা ও লালসা থেকে যায়।

৪. يقين এর প্রকারভেদ জানা গেল।

৫. প্রত্যেক নেয়ামত সম্পর্কে আখিরাতে প্রশ্ন করা হবে।