Tafsir Fathul Majid

Multiple Ayahs

Tags

Download Links

Tafsir Fathul Majid tafsir for Surah Al-Fil — Ayah 2

أَلَمۡ تَرَ كَيۡفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصۡحَٰبِ ٱلۡفِيلِ ١ أَلَمۡ يَجۡعَلۡ كَيۡدَهُمۡ فِي تَضۡلِيلٖ ٢ وَأَرۡسَلَ عَلَيۡهِمۡ طَيۡرًا أَبَابِيلَ ٣ تَرۡمِيهِم بِحِجَارَةٖ مِّن سِجِّيلٖ ٤ فَجَعَلَهُمۡ كَعَصۡفٖ مَّأۡكُولِۭ ٥

নামকরণ:

الْفِيْلِ শব্দের অর্থ : হাতি। সূরার প্রথম আয়াতে الْفِيْلِ শব্দ উল্লেখ আছে। এখান থেকেই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। তাছাড়া সূরাটি ইতিহাসের নিন্দিত আবরাহার হস্তীবাহিনী সম্পর্কে নাযিল করা হয়েছে বলে এ নামে নামকরণ করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্মের ৫০ বা ৫৫ দিন পূর্বে ইয়ামানের খ্রিস্টান গভর্ণর আবরাহা প্রশিক্ষিণপ্রাপ্ত হস্তীবাহিনীসহ বিশাল সৈন্যদল নিয়ে কাবাগৃহ ধ্বংস করার জন্য এসেছিল এবং আল্লাহ তা‘আলা যে পক্ষীকুল তাদের দ্বারা ধ্বংস করেছিলেন সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত আকারে আবরাহার হস্তী বাহিনীর ঘটনা:

৫৭০ খ্রীষ্টাব্দের কথা। হাবশার বাদশার তরফ থেকে ইয়ামান দেশে আবরাহা গভর্নর ছিল। সে সান‘আতে একটি খুব বড় গির্জা নির্মাণ করল। আর চেষ্টা করল, যাতে লোকেরা কাবা গৃহ ত্যাগ করে ইবাদত ও হাজ্জ উমরাহর জন্য এখানে আসে। এ কাজ মক্কাবাসী তথা অন্যান্য আরব গোত্রের জন্য অপছন্দনীয় ছিল। অতএব তাদের মধ্যে একজন আবরাহার নির্মাণকৃত উপাসনালয়ে পায়খানা করে নোংরা করে দিল। আবরাহার নিকট খবর পৌঁছল যে, গির্জাকে কেউ নোংরা ও অপবিত্র করে দিয়েছে। যার প্রতিক্রিয়ায় সে কাবা ঘরকে ধ্বংস করার দৃঢ় সংকল্প করল। সে বহু সংখ্যক সৈন্যসহ মক্কার ওপর হামলা করার উদ্দেশ্যে রওনা হল। কিছু হাতীও তাদের সাথে ছিল। মক্কার নিকট পৌঁছে সৈন্যরা নাবী (সাঃ)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিবের উটগুলো দখল করে নিল। এ ব্যাপারে আব্দুল মুত্তালিব আবরাহাকে বললেন : উটগুলো ফিরিয়ে দাও। (আবরাহা বলল : এখন আমরা তোমাদের কাবা ধ্বংস করতে এসেছি, আর তুমি কেবল উট ছেড়ে দেওয়ার দাবী কর? তিনি বললেন : উটগুলো আমার, তাই আমি সেগুলোর হেফাযত চাই) যিনি কাবা ঘরের মালিক তিনিই তাঁর ঘর রক্ষা করবেন। অতঃপর যখন এ সৈন্যদল “মুহাসসার” নামক উপত্যকার নিকট পৌঁছল, তখন আল্লাহ তা‘আলা ছোলা অথবা মসুরীর দানা সমপরিমাণ কাঁকর দিয়ে পাখি প্রেরণ করলেন, যারা ওপর থেকে সেই কাঁকর বর্ষণ করতে লাগল। যে সৈন্যের গায়ে এ কাঁকর লাগছিল তার গা থেকে মাংস খসে পড়ে গিয়েছিল এবং পরিশেষে মারা গিয়েছিল। সানআ পৌঁছতে পৌঁছতে খোদ আবরাহারও একই পরিণাম হয়েছিল। এভাবে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ঘর হেফাযত করলেন। (আয়সারুত তাফাসীর)

হস্তিবাহিনীর এ ঘটনা আরবদের মাঝে বহুল প্রচলিত ছিল। এমনকি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সময়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে অনেকে জীবিত ছিল। যেমন হাকীম বিন হেযাম, হাতেব বিন আব্দুল ওযযা, নওফেল বিন মু‘আবিয়া প্রমুখ। যারা প্রত্যেকে ১২০ বছর করে বয়স পেয়েছিল। এছাড়া উক্ত বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। যেমন হুদায়বিয়ার দিন রাসূল (সাঃ)-এর উট কাসওয়া বসে পড়লে তিনি বলেন: হস্তীবাহিনীকে বাধা দানকারী (আল্লাহ তা‘আলা) তাকে বাধা দিয়েছে। (সহীহ বুখারী হা. ২৭৩১)

أَلَمْ تَرَ অর্থ أَلَمْ تعلم অর্থাৎ তুমি কি জান না? এখানে জিজ্ঞাসা সাব্যস্তের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থ হলো: তুমি জান অথবা ঐ সব লোকেরা জানে, যারা তোমার যুগের। এরূপ এজন্যই বলা হয়েছে যে, এ ঘটনা ঘটার পর বেশি দিন অতিবাহিত হয়নি (যা শানে নুযূলে উল্লেখ করা হয়েছে)।

(كَيْدَهُمْ فِيْ تَضْلِيْلٍ)

অর্থাৎ কাবা ধ্বংস করার যে চক্রান্ত তারা করেছিল আল্লাহ তা‘আলা তা ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়নি।

أَبَابِيْلَ পাখির নাম নয়, বরং অর্থ হলো : ঝাঁকে ঝাঁকে। ইবনু আব্বাস ও মুজাহিদ (রহঃ) বলেন : একের পিছে এক, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। ইকরিমা (রহঃ) বলেন: সবুজ পাখি যা সমুদ্রের দিক থেকে এসেছিল। এছাড়াও বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। অনেকে আবাবিল দ্বারা এক প্রকার পাখি বুঝিয়ে থাকেন, কিন্তু আসলে তা নয় বরং আবাবিল অর্থ ঝাঁকে ঝাঁকে।

سِجِّيْلٍ বলা হয় এমন মাটিকে যা পুড়িয়ে কাঁকর তৈরি করা হয়েছে। কাঁকরের বৈশিষ্ট্য শানে নুযূলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) ও ইকরিমা (রহঃ) বলেন : ঐ কংকর যার গায়ে লেগেছে তার গায়ের চামড়া ফেটে বসন্তের গুটি বেরিয়েছে এবং সেবারই প্রথম বসন্ত রোগ দেখা দেয়। ইবনু ইসহাক বলেন : সে বছরই প্রথম আরবদেশে হাম ও বসন্ত রোগের আবির্ভাব ঘটে। (ইবনু কাসীর) এ আয়াতকে বিশ্লেষণ করেই ক্ষেপণাস্ত্র, কামান, রকেট ইত্যাদি আবিস্কার করেছে।

(فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفٍ مَّأْكُوْلٍ) - عصف

বলা হয় শস্যের শুকনো পাতা। আর مَّأْكُوْل বলা হয় শুকনো পাতা বা ঘাস ইত্যাদি চিবানোর পর যে অবস্থা হয়। অর্থাৎ পাথর নিক্ষেপের ফলে তাদের দেহের মাংস চিবানো নিস্পেষিত ঘাসের মত হয়ে গিয়েছিল। ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন: এর অর্থ, আল্লাহ তা‘আলা তাদের ধ্বংস ও নির্মূল করে দেন। তাদের সমস্ত চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেন। তাদের প্রায় সকলেই ধ্বংস হয়ে যায়। যারা ফিরে গিয়েছিল তারাও আহত অবস্থায় ফিরেছিল। যেমন তাদের নেতা আবরাহা কিছু সাথীসহ রাজধানী সানআতে পৌঁছে। কিন্তু তখন তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিঁড়ে পড়ছিল। অবশেষে তার বুক ফেটে কলিজা বেরিয়ে যায় এবং সে মৃত্যুবরণ করে। তবে তার আগে সে লোকদের কাছে আল্লাহ তা‘আলার গযবের কাহিনী বর্ণনা করে যায়। (ইবনু কাসীর)

ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন: আমাদের আলেমগণ বলেছেন: হস্তীবাহিনীর এ ঘটনা আমাদের নাবীর জন্য একটি মু‘জিযাহ ছিল। কেননা তিনি স্বচক্ষে ঘটনা দেখেননি অথচ যখন তিনি এ সূরা পাঠ করে শুনান তখন এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বহু লোক বেঁচে ছিল। তারা সবাই এ সূরার বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেছে। এমনকি আয়িশাহ (রাঃ) ঐ সময় বাল্য বয়সের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তিনি বর্ণনা করেন যে, আমি হাতির চালক ও সহিসকে অন্ধ অবস্থায় মানুষের কাছে খাদ্য চাইতে দেখেছি। (ইবনু হিশাম)

সুতরাং বাইতুল্লাহর হেফাযতের দায়িত্ব আল্লাহ তা‘আলা নিয়েছেন। তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত কোন শক্তিই তা ধ্বংস করতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

(وَمَنْ يُّرِدْ فِيْهِ بِإِلْحَادٍمبِظُلْمٍ نُّذِقْهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيْمٍ)

“আর যে ইচ্ছা করে সীমালঙ্গন করে তাতে পাপ কার্যের, তাকে আমি আস্বাদন করাব যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা হাজ্জ ২২ : ২৫)

সূরা হতে শিক্ষণীয় বিষয়:

১. ইতিহাসে নিন্দিত আবরাহার ধ্বংসপ্রাপ্ত হস্তিবাহিনী সম্পর্কে জানলাম।

২. যারাই ইসলাম ও মুসলিমদেরকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করেছে তারাই ধ্বংসে নিপতিত হয়েছে।

৩. ইসলাম বিদ্বেষীরা যত বড় শক্তিশালীই হোক না কেন আল্লাহ তা‘আলা তাদের ধ্বংস করতে ইচ্ছা করলে নিমেসেই যে-কোন আযাব দ্বারা শেষ করে দিতে পারেন।