Tafsir Fathul Majid

Multiple Ayahs

Tags

Download Links

Tafsir Fathul Majid tafsir for Surah At-Takwir — Ayah 22

فَلَآ أُقۡسِمُ بِٱلۡخُنَّسِ ١٥ ٱلۡجَوَارِ ٱلۡكُنَّسِ ١٦ وَٱلَّيۡلِ إِذَا عَسۡعَسَ ١٧ وَٱلصُّبۡحِ إِذَا تَنَفَّسَ ١٨ إِنَّهُۥ لَقَوۡلُ رَسُولٖ كَرِيمٖ ١٩ ذِي قُوَّةٍ عِندَ ذِي ٱلۡعَرۡشِ مَكِينٖ ٢٠ مُّطَاعٖ ثَمَّ أَمِينٖ ٢١ وَمَا صَاحِبُكُم بِمَجۡنُونٖ ٢٢ وَلَقَدۡ رَءَاهُ بِٱلۡأُفُقِ ٱلۡمُبِينِ ٢٣ وَمَا هُوَ عَلَى ٱلۡغَيۡبِ بِضَنِينٖ ٢٤ وَمَا هُوَ بِقَوۡلِ شَيۡطَٰنٖ رَّجِيمٖ ٢٥ فَأَيۡنَ تَذۡهَبُونَ ٢٦ إِنۡ هُوَ إِلَّا ذِكۡرٞ لِّلۡعَٰلَمِينَ ٢٧ لِمَن شَآءَ مِنكُمۡ أَن يَسۡتَقِيمَ ٢٨ وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٢٩

১৫-২৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর:

অত্র আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা কয়েকটি বস্তুর শপথ করে বলছেন যে, কুরআন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে জিবরীল (আঃ)-এর আনীত বাণী কোন শয়তানের বাণী নয়।

الْـخُنَّسِ শব্দটি বহুবচন, একবচন হল خانس و خانسة অর্থ যখন পিছিয়ে গেল, হারিয়ে গেল। الْـخُنَّسِ বলা হয়, সাতটি চলমান তারকা যা পূর্বাকাশে বিলম্বে অস্ত যায়। সে সাতটি হলো সূর্য, চন্দ্র, জাহরাহ, মুশতারি, মিরইয়াঝ, জাহাল ও আতারিদ। এ সাতটি তারকার চলার দু’টি পথ:

১. পশ্চিম দিকের পথ যে পথে সকল তারকা চলে।

২. পূর্ব দিকে উল্টোভাবে।

الْـجَوَارِ বহুবচন, একবচন হল جَارية, অর্থ সন্তরণশীল।

الْكُنَّسِ অর্থ : লুকিয়ে যাওয়া। আলী (রাঃ) বলেন : এগুলি হল ঐসব তারকা, যা দিনের বেলায় লুকিয়ে থাকে ও রাতের বেলায় প্রকাশিত হয় (কুরতুবী)। বিজ্ঞানীরা এখান থেকে “ব্লাক হোল” এর তথ্য প্রমাণ করেছেন।

عَسْعَسَ শব্দটি বিপরীতার্থক শব্দ। অর্থাৎ যখন রাত্রি আগমন করে এবং বিদায় নেয়।

تَنَفَّسَ এর আসল অর্থ হলো পেট থেকে শ্বাস বের হওয়া (কুরতুবী)। রাতের অন্ধাকার ভেদ করে সূর্যের আলো বেরিয়ে আসে এ কথাটি ফুটিয়ে তোলার জন্য এখানে تَنَفَّسَ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ যখন সকাল প্রকাশ পায় ও উদয় হয় অথবা উজ্জ্বল হয়ে বের হয়ে আসে। এসব উল্লিখিত শপথসমূহের জবাব হলো যে, নিশ্চয়ই এ কুরআন সম্মানিত জিবরীল (আঃ)-এর আনীত বাণী। নাবী মুহাম্মাদ, ফেরেশতা বা কোন শয়তানের কথা নয় যা মক্কার মুশরিকরা দাবী করে থাকে। পরের দু আয়াতে জিবরীল (আঃ)-এর চারটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।

(ذِيْ قُوَّةٍ) ‘সে শক্তিশালী’ অর্থাৎ জিরবীল (আঃ) এত শক্তিশালী যে ওয়াহী নিয়ে আসার সময় শয়তান তার কাছে ভিড়তে পারে না। দুনিয়াতে জিবরীল (আঃ)-এর শক্তিমত্তার বহু প্রমাণ রয়েছে। যেমন লূত (আঃ)-এর জাতিকে ভূমি ও নগরীসহ চোখের পলকে উৎপাটিত করে ফেলা এলাকা এখন মৃত সাগর নামে পরিচিত। নাবী (সাঃ)-কে যখন তায়েফবাসীরা আঘাত করল তখন জিবরীল  বলল: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমাকে বলুন আমি এদেরকে দু পাহাড় একত্রিত করে পিষে মেরে ফেলি। (সহীহ বুখারী, কিতাবু বাদইল খালক) জিরবীল (আঃ)-এর কাছ থেকে ওয়াহী ছিনিয়ে নেয়ার মত কোন শক্তি নেই এবং তিনি কোন প্রকার খেয়ানত করেননি।

(عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِيْنٍ)

অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার নিকট তার অনেক মর্যাদা রয়েছে।

(مُّطَاعٍ ثَمَّ أَمِيْنٍ)

অর্থাৎ জিবরীল (আঃ) ঊর্ধ্বজগতে আনুগত্যপ্রাপ্ত। তিনি সাধারণ ফেরেশতা নন বরং ফেরেশতাদের সর্দার এবং তিনি ওয়াহীর ক্ষেত্রেও আমানতদার। তাতে তিনি কম-বেশি করেননি এবং যা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার লংঘন করেননি। তাই যেসব শিয়া বলে থাকে, জিবরীল (আঃ) খেয়ানত করত ওয়াহী আলী (রাঃ)-এর কাছে না নিয়ে এসে মুহাম্মাদের কাছে এসেছেÑতাদের এ দাবী মিথ্যা। কারণ তিনি খেয়ানত করে এরূপ করলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে “আমীন” বলে আখ্যায়িত করতেন না।

(وَمَا صَاحِبُكُمْ....)

দ্বারা উদ্দেশ্য নাবী (সাঃ)। আর সম্বোধন হলো মক্কাবাসীদেরকে। নাবী (সাঃ) صَاحِبُ বা সাথী বলার কারণ হলো মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে তাদের সাথেই ছোট থেকে বড় হতে দেখেছে, একই সমাজে লালিত-পালিত হয়েছেন।

(وَلَقَدْ رَاٰهُ بِالْأُفُقِ....)

অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জিবরীল (আঃ)-কে তার নিজস্ব আকৃতিতে দেখেছেন। তাই জিবরীল (আঃ) তাঁর কাছে পরিচিত, একমাত্র তিনিই নাবী (সাঃ)-এর কাছে ওয়াহী নিয়ে আসতেন। এ সম্পর্কে সূরা নাজমের শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে।

(وَمَا هُوَ عَلَي الْغَيْبِ بِضَنِيْنٍ)

অর্থাৎ মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর ওপর যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে সে বিষয়ে তিনি কৃপণ নন যে, তিনি কিছু তা হতে গোপন করবেন। বরং তিনি আকাশবাসী ও জমিনবাসী সকলের নিকট আমানতদার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيْلِ لا ‏ لَاَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِيْنِ ‏ ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِيْنَ)

“যদি সে নিজে কোন কথা বানিয়ে আমার কথা বলে চালিয়ে দিত, তবে অবশ্যই আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম, এবং কেটে দিতাম তার হৃৎপিণ্ডের শিরা।” (সূরা হাককাহ ৬৯: ৪৪-৪৬)

(وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ رَّجِيْمٍ)

অর্থাৎ যেমন শয়তান আসমানের কিছু সংবাদ চুরি করে শোনে অতঃপর তা অসম্পূর্ণভাবে জ্যোতিষীকে বলে দেয়। কুরআন এরূপ না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(وَمَا تَنَزَّلَتْ بِهِ الشَّيٰطِيْنُ ج ‏ ومَا يَنـبَغِيْ لَهُمْ وَمَا يَسْتَطِيْعُوْنَ إِنَّهُمْ عَنِ السَّمْعِ لَمَعْزُوْلُوْنَ)‏

“শয়তানরা (এ কুরআন) তা-সহ অবতীর্ণ হয়নি। তারা এ কাজের যোগ্য নয় এবং তারা এটার সামর্থ্যও রাখে না। তাদেরকে (ওয়াহী) শ্রবণের সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে।” (সূরা শুআরা ২৬: ২১০)

সুতরাং যারা নাবী (সাঃ)-কে গণক জ্যোতিষী বলে থাকে তাদের দাবীও খণ্ডন করা হয়েছে।

(فَأَيْنَ تَذْهَبُوْنَ)

অর্থাৎ যে কুরআন একজন আমানতদার ফেরেশতা একজন আমানতদার ব্যক্তির কাছে নিয়ে আসলেন যাতে শয়তানের হস্তক্ষেপের কোন অবকাশ নেই তারপরেও তোমরা কিভাবে এ কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছো? কেন তা হতে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ ? আর কেন তাঁর আনুগত্য কর না?

(ذِكْرٌ لِّلْعٰلَمِيْنَ)

অর্থাৎ এ কুরআন বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ। যারা হিদায়াত গ্রহণ করতে চায় তাদের জন্য পথপ্রদর্শকÑ যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(إِنَّ هٰذِه۪ تَذْكِرَةٌ ج فَمَنْ شَا۬ءَ اتَّخَذَ إِلٰي رَبِّه۪ سَبِيْلًا) ‏

“এটা এক উপদেশবাণী, অতএব যার ইচ্ছা সে তার প্রতিপালকের দিকে যাওয়ার পথ অবলম্বন করুক।” (সূরা দাহর ৭৬: ২৯)

(وَمَا تَشَا۬ءُوْنَ إِلَّآ أَنْ يَّشَا۬ءَ اللّٰهُ)

অর্থাৎ চাওয়া পাওয়া শুধু তোমাদের দিকে সোপর্দ করে দেয়া হয়নি। বরং তোমাদের চাওয়া-পাওয়া আল্লাহ তা‘আলার চাওয়ার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তা‘আলা যাকে চান ও ভালবাসেন তাকে হিদায়াত দান করেন আর যাকে চান না ও ভালবাসেন না তাকে হিদায়াত দেন না। সুলাইমান বিন মূসা (রহঃ) বলেন : যখন

(لِمَنْ شَا۬ءَ مِنْكُمْ أَنْ يَّسْتَقِيْمَ)

আয়াতটি অবতীর্ণ হলো তখন আবূ জাহল বলল : সঠিক পথে বহাল থাকা আর না থাকা আমাদের হাতে আমরা ইচ্ছা করলে থাকতেও পারি নাও পারি। তখন

(وَمَا تَشَا۬ءُوْنَ إِلَّآ أَنْ يَّشَا۬ءَ اللّٰهُ)

অবতীর্ণ হয়। (ইবনু কাসীর)। তাই ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন : আবূ জাহল হল তাকদীর অস্বীকারকারী কাদরীয়াদের নেতা। আল্লাহ তা‘আলার মাশিয়াত বা ইচ্ছা এবং এ সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহর অবস্থান সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

কুরআন আল্লাহ তা‘আলার বাণী, একজন আমানতদার ফেরেশতা আমানতদার রাসূলের নিকট নিয়ে এসেছেন। তাই কুরআন যা নির্দেশ করে তা সত্য এবং বাস্তবসম্মত।

আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:

১. জিবরীল (আঃ)-এর বৈশিষ্ট্যের কথা জানতে পারলাম।

২. কুরআন আল্লাহ তা‘আলার বাণী, কোন বিতাড়িত শয়তান, গণক বা জ্যোতিষীর কথা নয়।

৩. মানুষের ইচ্ছা আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছাধীন। মানুষ ইচ্ছা করলেই সব করতে পারে না, যদি আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা না করেন।