You are reading tafsir of 14 ayahs: 81:1 to 81:14.
নামকরণ ও প্রেক্ষাপট:
প্রথম আয়াতে উল্লিখিত শব্দ كورت এর মূল উৎস تكوير (তাকভীর)। যার অর্থ : গোলাকার করা, গুটিয়ে নেয়া ইত্যাদি। তাই আরবীতে কাপড় ইস্ত্রী করাকে كوي বলা হয়। কারণ ইস্ত্রী করার মাধ্যমে কাপড় ভাঁজ করে নেয়া হয়। كورت শব্দ থেকেই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। সূরাতে বিশেষ করে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্ব মূহূর্তে চন্দ্র-সূর্য, তারকা, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদির যে একটি ভয়াবহ অবস্থা হবে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে, কিয়ামতের দৃশ্যকে স্বচক্ষে দেখবে সে যেন সূরা তাকভীর, সূরা ইনফিতার ও সূরা ইনশিকাক পাঠ করে। (তিরমিযী হা. ৩৩৩৩, সিলসিলা সহীহাহ হা. ১০৮১)
বিশিষ্ট সাহাবী উবাই বিন কা‘ব (রাঃ) বলেন : (১) মানুষ হাট-বাজারে মশগুল থাকবে, (২) নক্ষত্রসমূহ খসে পড়বে, (৩) পাহাড়সমূহ মাটির ওপর ভেঙ্গে পড়বে ও সারা পৃথিবী কম্পিত ও আন্দোলিত হবে, (৪) এ সময় জিন-ইনসান সব ভয়ে ছুটোছুটি করবে, (৫) পশু-পক্ষি সব ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে যাবে, (৬) সমুদ্র সব অগ্নিময় হয়ে একাকার হয়ে যাবে। এরপর একটি বায়ূ প্রবাহিত হবে, যা সকল মানুষকে মেরে ফেলবে। (ইবনু কাসীর, কুরতুবী)
১-১৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর:
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : كورت অর্থ أظلمت বা অন্ধকার হয়ে যাবে। কাতাদাহ (রহঃ) বলেন : তার আলো চলে যাবে। যায়েদ বিন আসলাম (রহঃ) বলেন : সূর্য জমিনের ওপর পড়ে যাবে। আল্লামা ইবনু জারীর (রহঃ) বলেন : এ ব্যাপারে আমাদের নিকট সঠিক কথা হলো : تكوير অর্থ : একটি জিনিসের এক অংশ অন্য অংশের সাথে ভাঁজ করা। তাই মাথায় লেপটিয়ে পাগড়ী ভাঁজ করে নেয়াকে تكوير বলা হয়। অতএব আয়াতের অর্থ হলো : সূর্যকে গুটিয়ে নিয়ে নিক্ষেপ করা হবে ফলে তার আলো চলে যাবে। (ইবনু কাসীর)
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত নাবী (সাঃ) বলেন :
الشَّمْسُ وَالقَمَرُ مُكَوَّرَانِ يَوْمَ القِيَامَةِ
কিয়ামতের দিন সূর্য ও চন্দ্রকে ভাঁজ করে নেয়া হবে। (সহীহ বুখারী হা. ৩২০০)
انْكَدَرَتْ অর্থ : انتثرت বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। ফলে তারকার আলো চলে যাবে। কালবী ও আতা (রহঃ) বলেন : সেদিন আকাশ থেকে তারকার বৃষ্টি বর্ষিত হবে ফলে আকাশে কোন তারকা থাকবে না। (ফাতহুল কাদীর)
এগুলো আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শন। তাঁর নির্দেশে আলো দিচ্ছে আর তাঁর নির্দেশেই কিয়ামতের পূর্বে আলোহীন হয়ে যাবে। তাই চন্দ্র-সূর্যসহ যেকোন বড় ধরণের নিদর্শনের ইবাদত করা যাবে না, বরং ইবাদত করবে এসব মাখলূকের সৃষ্টিকর্তার জন্য। শুধু তাই নয়, সূর্য-চন্দ্র ও অন্য যেসব বস্তুকে লোকেরা পূজা করত, সবগুলিকে আল্লাহ তা‘আলা ঐদিন জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। এসব জিনিসকে শাস্তিদানের জন্য নয় বরং যারা তাদের পূজা করত তাদের ধিক্কার দেয়ার জন্য।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(إِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ ط أَنْتُمْ لَهَا وَارِدُوْنَ )
“তোমরা ও আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ‘ইবাদত কর সেগুলো তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সকলে তাতে প্রবেশ করবে।” (সূরা আম্বিয়া ২১: ৯৮)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : সূর্য ও চন্দ্র কিয়ামতের দিন দু’টি ষাঁড়ের আকৃতিতে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। (সহীহ বুখারী হা. ৩২০০) সুতরাং যারা সূর্যের পূজা করে তাদের এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত যে, সূর্য একটি মাখলূক তা কখনও মা‘বূদ হতে পারে না।
سُيِّرَتْ অর্থাৎ জমিন থেকে মূলোৎপাটন করা হবে এবং শূন্যে চালিত করা হবে ফলে পর্বতসমূহ বিক্ষিপ্ত ধূলিকণার ন্যায় হয়ে যাবে। কিয়ামতের পূর্বে পাহাড়ের কী অবস্থা হবে এ সম্পর্কে সূরা নাবায় আলোচনা করা হয়েছে।
الْعِشَارُ শব্দটি عشراء এর বহুবচন। অর্থ : এমন গর্ভবতী উটনী যার গর্ভধারণের দশমাস পূর্ণ হয়ে গেছে।
عُطِّلَتْ অর্থাৎ ছেড়ে দেয়া হবে, কোন রাখাল থাকবে না। এখানে দশমাসের গর্ভবতী উটনীকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো : এরূপ গর্ভবতী উটনী আরবদের নিকট খুবই প্রিয়। এত প্রিয় বস্তু হওয়ার পরেও কিয়ামতের আতংক তাদেরকে এ সম্পর্কে গাফেল করে ফেলবে। এত মূল্যবান জিনিস কি হয়ে গেল বা কোথায় চলে গেল কোন খোঁজ খবর থাকবে না। অথবা বলা হয়, এটা উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়েছে কেননা কিয়ামত দিবসে কোন গর্ভবতী উটনী থাকবেনা। উদ্দেশ্য হলো : যদি কিয়ামতের দিন কোন মানুষের এরূপ মূল্যবান সম্পদ থাকত তাহলে এরূপ মূল্যবান সম্পদও ছেড়ে দিত, কিয়ামতের ভয়াবহতা দেখে তার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করত না ।
حُشِرَتْ অর্থাৎ প্রাণীগুলোকে কিসাস আদায় করার জন্য পুনর্জীবিত করে একত্রিত করা হবে । ফলে দুনিয়াতে যে প্রাণীর শিং ছিল না আর তাকে শিংওয়ালা প্রাণী শিং দ্বারা আঘাত করে ছিল সে প্রাণী কিয়ামতের দিন শিংওয়ালা প্রাণীকে অনুরূপ আঘাত করে কিসাস আদায় করে নেবে। পরে তারা আবার মাটিতে পরিণত হয়ে যাবে। এ অবস্থা দেখে কাফিররা বলবে হায়! আমরা যদি এরূপ হয়ে যেতাম।
سُجِّرَتْ অর্থ :
أوقدت فصارت نارا تضطرم
বা আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হবে ফলে সাগর আগুনে প্রজ্বলিত হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন :
لَا يَرْكَبُ الْبَحْرَ إِلَّا حَاجٌّ، أَوْ مُعْتَمِرٌ، أَوْ غَازٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، فَإِنَّ تَحْتَ الْبَحْرِ نَارًا، وَتَحْتَ النَّارِ بَحْرًا
সমুদ্রে হাজ্জে বা উমরায় গমনকারী অথবা জিহাদ হতে প্রত্যাবর্তনকারী গাজী ব্যতীত যেন কেহ আরোহণ না করে। কেননা সমুদ্রের নীচে আগুন আর আগুনের নীচে পানি। (আবূ দাঊদ হা. ২৪৮৯ দুর্বল)
زُوِّجَتْ অর্থাৎ প্রত্যেক আমলকারীকে তার অনুরূপ আমলকারীর সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হবে। ফলে ভাল ব্যক্তিরা ভাল ব্যক্তিদের সাথে থাকবে, খারাপ ব্যক্তিরা খারাপ ব্যক্তিদের সাথে থাকবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(اُحْشُرُوا الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا وَأَزْوَاجَهُمْ وَمَا كَانُوْا يَعْبُدُوْنَ)
“(ফেরেশতাদেরকে বলা হবে : ) একত্র কর জালিমদেরকে এবং তাদের সাথীদেরকে আর তাদেরকে যাদের তারা ‘ইবাদত করত।” (সূরা সফফাত ৩৭ : ২২) তাই উমার (রাঃ) খুৎবায় বলতেন : يقرن الفاجر مع الفاجر ويقرن الصالح مع الصالح অসৎ লোাকদেরকে অসৎ ব্যক্তির সাথে এবং সৎ লোকদেরকে সৎ ব্যক্তির সাথে মিলিয়ে দেয়া হবে। (ইবনু কাসীর)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন :
المَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ
কিয়ামতের দিন মানুষ তার সাথে থাকবে, যাকে সে দুনিয়াতে ভালবাসতো। (সহীহ বুখারী হা. ৬১৬৮) সুতরাং আমাদের উচিত হবে নাবী, সিদ্দীক, শহীদ, সৎ ও তাক্বওয়াবান ব্যক্তিদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা এবং তাদেরকেই ভালবাসা, তাহলে আশা করা যায় তাদের সাথে আমাদের হাশর হবে।
الْمَوْؤ۫دَةُ বলা হয় المدفونة حية বা জীবন্ত প্রোথিত সন্তানকে। অর্থাৎ জাহিলী যুগের মানুষেরা কন্যা সন্তানদেরকে জীবন্ত প্রোথিত করত। কারণ কন্যা সন্তান তাদের নিকট অপমানজনক বলে মনে করত। জাহেলী যুগের আরবরা কয়েকভাবে কন্যা সন্তান হত্যা করত।
১. প্রসবের পূর্বক্ষণে ঘরের মধ্যে গর্ত খনন করে রাখত, কন্যা সন্তান হলে সাথে সাথে গর্তে পুঁতে দিত।
২. মেয়ে একটু বড় হলে বাবা তাকে নিয়ে কোন কুয়ায় নিক্ষেপ করত।
৩. কন্যার বয়স ছয় থেকে সাত বছর হলে পিতা কন্যার মাকে বলত মেয়েকে ভালভাবে সাজিয়ে দিতে। তারপর আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে মুরুভুমিতে গর্ত খুড়ে পুঁতে দিত। এসব জীবন্ত প্রোথিত কন্যদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে কি কারণে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। এটা জানা কথা যাদেরকে জীবন্ত প্রোথিত করা হয়েছে তাদের কোন অপরাধ নেই, মূলত উদ্দেশ্য হলো হত্যাকারীরদেরকে ভর্ৎসনা করা।
উক্কাশ (রাঃ)-এর বোন জুদামাহ বিনতু ওহাব (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট হাযির হলাম তখন তিনি লোকজনকে বলছিলেন : আমি গর্ভাবস্থায় স্ত্রী সহবাস করতে তোমাদেরকে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম রূম ও পারস্যবাসীরা গর্ভাবস্থায় স্ত্রী সহবাস করে এবং তাতে তাদের সন্তানের কোন ক্ষতি হয় না। তখন সাহাবীগণ আযল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। (আযল হলো স্ত্রী সহবাসের সময় পুরুষাঙ্গ স্ত্রীর গোপাঙ্গের ভেতর থেকে বের করে নেওয়া যাতে বীর্য স্ত্রীর জরায়ুতে যেতে না পারে।) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জবাবে বললেন : এটা গুপ্ত হত্যার নামান্তর। আর এরূপ গুপ্ত হত্যাকৃত সন্তানকে জিজ্ঞাসা করা হবে। (সহীহ মুসলিম, আবূ দাঊদ হা. ৩৮৮২)
এ অপরাধ তখন হবে যখন দারিদ্রতার ভয়ে বা কন্যা সন্তানের লজ্জায় হত্যা করবে। কিন্তু যদি স্ত্রীর বাচ্চা নিলে ক্ষতি হয় বা যে বাচ্চা আছে তার ক্ষতি হয় তাহলে এতে অপরাধী হবে না।
نُشِرَتْ যহহাক (রহঃ) বলেন : প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আমলনামা প্রদান করা হবে হয় ডান হাতে অথবা বাম হাতে। ফলে প্রত্যেক ব্যক্তি তার আমলনামা পড়তে পারবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اِقْرَأْ كِتٰبَكَ ط كَفٰي بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيْبًا)
‘তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসেব নিকেশের জন্য যথেষ্ট।’ (সূরা ইসরা ১৭ : ১৪) আমলনামা পড়ে মানুষ আশ্চর্য হয়ে বলবে:
(يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هٰذَا الْكِتٰبِ لَا يُغَادِرُ صَغِيْرَةً وَّلَا كَبِيْرَةً إِلَّآ أَحْصَاهَا)
“হায়, দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! যে ছোট বড় কিছুই বাদ দেয়া হয়নি; বরং সমস্তই হিসেব রেখেছে।’ (সূরা কাহ্ফ ১৮: ৪৯)
كُشِطَتْ অর্থ : أزليت বা অপসারণ করা হবে, সরিয়ে দেয়া হবে।
سُعِّرَتْ অর্থ : প্রজ্জ্বলিত করা। সেদিন জাহান্নামকে এত প্রজ্জ্বলিত করা হবে যা পূর্বে কখনও করা হয়নি। أُزْلِفَتْ অর্থাৎ قربت إلي أهلها জান্নাতকে জান্নাতীদের নিকটবর্তী করা হবে। যেমন অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِيْنَ غَيْرَ بَعِيْدٍ )
“আর জান্নাতকে নিকটস্থ করা হবে মুত্তাকীদের জন্য, কোন দূরত্ব থাকবে না। ” (সূরা ক্বাফ ৫০ : ৩১)
হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন : এর অর্থ হল মুত্তাকীদেরকে জান্নাতের নিকটে নেয়া হবে। এটা নয় যে, জান্নাত তার স্থান থেকে সরে আসবে। (কুরতুবী)
مَّآ أَحْضَرَتْ অর্থাৎ সে সকল আমলনামা তার সামনে উপস্থিত হয়েছে যা সে দুনিয়াতে করেছিল। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন
(وَوَجَدُوْا مَا عَمِلُوْا حَاضِرًا)
“তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে; (সূরা কাহ্ফ ১৮ : ৪৯) যেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন তার কৃত আমলের আমলনামা দেয়া হবে সেহেতু প্রত্যেক মু’মিন ব্যক্তিকে সৎআমল করা উচিত।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কিয়ামতের পূর্বে যে সকল ভয়ংকর ঘটনা ঘটবে সে সম্পর্কে জানলাম।
২. প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের ফলাফল সামনে উপস্থিত পাবে।
৩. বিনা প্রয়োজনে ইচ্ছাকৃত সন্তান না নেয়া জীবন্ত প্রোথিত করার নামান্তর।