Tafsir Fathul Majid

Multiple Ayahs

Tags

Download Links

Tafsir Fathul Majid tafsir for Surah Al-Layl — Ayah 3

وَٱلَّيۡلِ إِذَا يَغۡشَىٰ ١ وَٱلنَّهَارِ إِذَا تَجَلَّىٰ ٢ وَمَا خَلَقَ ٱلذَّكَرَ وَٱلۡأُنثَىٰٓ ٣ إِنَّ سَعۡيَكُمۡ لَشَتَّىٰ ٤ فَأَمَّا مَنۡ أَعۡطَىٰ وَٱتَّقَىٰ ٥ وَصَدَّقَ بِٱلۡحُسۡنَىٰ ٦ فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلۡيُسۡرَىٰ ٧ وَأَمَّا مَنۢ بَخِلَ وَٱسۡتَغۡنَىٰ ٨ وَكَذَّبَ بِٱلۡحُسۡنَىٰ ٩ فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلۡعُسۡرَىٰ ١٠ وَمَا يُغۡنِي عَنۡهُ مَالُهُۥٓ إِذَا تَرَدَّىٰٓ ١١

নামকরণ:

اللَّيْلِ শব্দের অর্থ : রাত। সূরার প্রথম আয়াতের اللَّيْلِ শব্দ থেকেই উক্ত নামে সুরার নামকরণ করা হয়েছে।

১-১১ নম্বর আয়াতের তাফসীর:

সূরাটির শুরুতেই মহান আল্লাহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের শপথ করেছেন যে সময়গুলোতে মানুষ বিভিন্ন আমল করে থাকে। কর্ম প্রচেষ্টার দিক দিয়ে পৃথিবীতে মানুষ দু’ধরণের হতে পারে। এক. যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা সঠিক পথে চলার জন্য সহজ করে দিয়েছেন। এরাই সফলকাম এবং তাদের তিনটি গুণাবলী উল্লেখ করা হয়েছে। দুই. যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ভ্রান্তপথে চলার জন্য সহজ করে দিয়েছেন। এরা ব্যর্থকাম এবং এদের তিনটি দোষ বর্ণনা করা হয়েছে।

(إِذَا يَغْشٰي) অর্থ: يعم الخلق بظلامه

বা সমস্ত সৃষ্টি জীবকে রাত তার অন্ধকার দ্বারা আচ্ছাদিত করে নেয়। ফলে সবাই স্বীয় আশ্রয়স্থলে আশ্রয় নেয় এবং সারাদিনের ক্লেশ ক্লান্তি থেকে বিশ্রাম গ্রহণ করে।

تَجَلّٰي অর্থাৎ সৃষ্টি জীবের জন্য যখন দিন আলোকজ্জ্বল হয়ে যায়। ফলে সবকিছু তার আলোয় আলোকিত হয় এবং সবাই কর্মস্থলে চলে যায়। আলকামাহ (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদের কতক ছাত্রদের একটি দলের সাথে শামে গেলাম। আবূ দারদা আমাদের আগমনের কথা শুনতে পেয়ে কাছে এসে বললেন : তোমাদের মধ্যে কেউ কি আছে যে কুরআন পড়তে পারে? আমরা বললাম : হ্যাঁ, তিনি বললেন : কে অধিক ভাল পড়তে পারে? (আলকামাহ) বললেন: সবাই আমার দিকে ইশারা করল। তিনি বললেন: পড়! আমি পড়লাম,

(وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشٰي .......الذَّكَرَ وَالْأُنْثٰٓي)

তুমি কি তোমার সাথীর (ইবনু মাসঊদ) মুখ থেকে শুনেছ? আমি বললাম: হ্যাঁ, তিনি বললেন: আমিও তা নাবী (সাঃ)-এর মুখ থেকে শুনেছি। (সহীহ বুখারী হা. ৪৯৪৩) রাতের আচ্ছন্ন করা এবং দিনের আলোকিত হওয়ার শপথ করে আল্লাহ তা‘আলা এ দুয়ের কল্যাণকর বিষয়ে চিন্তা-গবেষণার প্রতি যেমন বান্দার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তেমনি দুনিয়ায় নেক আমলের মাধ্যমে আখিরাতে মুক্তির পথ বেছে নেয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন।

(وَمَا خَلَقَ) এখানে আল্লাহ তা‘আলা নিজ সত্ত্বার শপথ করেছেন। কেননা তিনি হলেন নর নারী উভয়ের সৃষ্টিকর্তা। এ ক্ষেত্রে ما মাওসূলা الذي বা যিনি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর ما মাসদার বা ক্রিয়ামূল হলে অর্থ হবে শপথ নর নারী সৃষ্টির। (তাফসীর সা‘দী) মোট কথা আল্লাহ তা‘আলা নর নারী সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(وَمِنْ كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنَ)

“আমি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছি জোড়ায়-জোড়ায়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” (সূরা যারিয়াত ৫১: ৪৯)

(إِنَّ سَعْيَكُمْ لَشَتّٰي)

এটা হলো পূর্ববর্তী শপথসমূহের জবাব। মানুষ বিভিন্ন রকম আমল করে থাকে। যে ব্যক্তি ভাল আমল করবে তার প্রতিদান জান্নাত আর যে খারাপ আমল করবে তার প্রতিদান জাহান্নাম।

অথবা আয়াতের অর্থ হলো তোমাদের কাজকর্ম ভিন্ন ভিন্ন। কেউ চাকুরী করে, কেউ কৃষি কাজ করে ইত্যাদি। তবে যে যাই করুক সব ধরনের কাজের হিসাব দিতে হবে।

(مَنْ أَعْطٰي وَاتَّقٰي)

অর্থাৎ সম্পদ ব্যয় করে যেসব ইবাদত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেমন যাকাত প্রদান করা, সাদকাহ করা ও ভাল কাজে ব্যয় করা ইত্যাদি। আর যে সকল শারীরিক ইবাদত করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, যেমন সালাত আদায় করা, সিয়াম পালন করা। যে সকল ইবাদত অর্থ ব্যয় ও শারীরিক পরিশ্রম উভয়ের সমন্নয়ে হয়ে থাকে; যেমন হাজ্জ, উমরা ইত্যাদি। এসব ইবাদত যারা করে থাকে এবং হারাম কাজ বর্জন ও নিদের্শমূলক কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে আর আমলের হিসাব ও নেকীর বিশ্বাস রাখে তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আল্লামা সা‘দী (রহঃ) বলেন : صدق بالحسني বা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং এটা যার ওপর প্রমাণ বহন করে সব সত্য বলে বিশ্বাস করে। (তাফসীর সা‘দী)

لِلْيُسْرٰي ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : কল্যাণকর কাজের পথ সহজ করে দেব। জায়েদ বিন আসলাম (রহঃ) বলেন : জান্নাতের পথ সহজ করে দেব। মোট কথা তার জন্য এমন সব কাজ সহজ করে দেয়া হবে যা করলে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি بَخِلَ অর্থাৎ সম্পদ সম্পর্কীয় ও শারীরিকসহ সকল ফরয বিধান পালন করে না এবং الحسني (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) তা অস্বীকার করে তার জন্য জাহান্নামের কাজ সহজ করে দেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(وَنُقَلِّبُ اَفْئِدَتَھُمْ وَاَبْصَارَھُمْ کَمَا لَمْ یُؤْمِنُوْا بِھ۪ٓ اَوَّلَ مَرَّةٍ وَّنَذَرُھُمْ فِیْ طُغْیَانِھِمْ یَعْمَھُوْنَ)

“তারা যেমন প্রথমবারে তাতে ঈমান আনেনি আমিও তাদের মনোভাবের ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে দেব এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াতে দেব।” (সূরা আনআম ৬: ১১০)

আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : একদা কোন এক জানাযায় নাবী (সাঃ)-এর সাথে আমরা ছিলাম। তখন নাবী (সাঃ) বললেন :

مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ كُتِبَ مَقْعَدُهُ مِنَ الجَنَّةِ، وَمَقْعَدُهُ مِنَ النَّارِ

তোমাদের প্রত্যেকের স্থান জান্নাতে বা জাহান্নামে নির্ধারিত করা আছে। সাহাবী বললেন : তার ওপর নির্ভর করে থাকব না? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন:

اعْمَلُوا فَكُلٌّ مُيَسَّرٌ

তোমরা আমল করে যাও কারণ প্রত্যেকের জন্য সেই আমলই সহজ করে দেয়া হয়েছে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তারপর নাবী (সাঃ) এ আয়াতগুলো পাঠ করলেন। (সহীহ বুখারী হা. ৪৯৪৫)

আলী (রাঃ) থেকেই অন্য বর্ণনায় রয়েছে জনৈক ব্যক্তি বলল : হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ! আমরা কি আমাদের লিপিবদ্ধ কিতাবের ওপর নির্ভর করে আমল করা ছেড়ে দেব না? আমাদের মধ্যে যে সৌভাগ্যবান সে সৌভাগ্যবানদের আমলের দিকেই ধাবিত হবে। আর যে দুর্ভাগ্যবান সে দুর্ভাগ্যবানদের আমলের দিকেই ধাবিত হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন : যারা সৌভাগ্যবান তাদের জন্য সৌভাগ্যবানদের আমল করা সহজ হয়ে যাবে। তারপর

(فَأَمَّا مَنْ أَعْطٰي.... لِلْيُسْرٰي)

আয়াতগুলো পাঠ করেন। (সহীহ বুখারী হা. ৪৯৪৮)

(إِذَا تَرَدّٰي) মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: অর্থ হলো إذا مات বা যখন মারা যাবে। জায়েদ বিন আসলাম বলেন:

إِذَا تَرَدّٰي في النار

বা যখন সে জাহান্নামে পতিত হবে তখন তার সম্পদ কোন উপকারে আসবে না। কেননা মানুষ মারা গেলে তার আমলই কেবল সাথে যায়, অন্যদিকে দুনিয়াতে যে সম্পদ রেখে গেছে যার হক আদায় করেনি তা তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

অতএব এ কথা বলার কোন সুযোগ নেই, আমার তাকদীর তো পূর্বে লেখাই আছে আর আমল করার কোন প্রয়োজন নেই। না, এরূপ ধারণা ঠিক নয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে দুনিয়াতে প্রেরণ করছেন পরীক্ষা করার জন্য, কে সৎ আমলে উত্তম।

আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:

১. যারা সৎ আমল করে এবং আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে তাদের জন্য তিনি জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। পক্ষান্তরে যারা এর বিপরীত আমল করে তাদের জন্য জাহান্নামের পথ সহজ করে দেন।

২. তাকদীর পূর্ব থেকেই লিপিবদ্ধ রয়েছে বলে আমল ছেড়ে বসে থাকা যাবে না।