Tafsir Fathul Majid

Multiple Ayahs

Tags

Download Links

Tafsir Fathul Majid tafsir for Surah Al-Qadr — Ayah 4

إِنَّآ أَنزَلۡنَٰهُ فِي لَيۡلَةِ ٱلۡقَدۡرِ ١ وَمَآ أَدۡرَىٰكَ مَا لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ ٢ لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٞ مِّنۡ أَلۡفِ شَهۡرٖ ٣ تَنَزَّلُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَٱلرُّوحُ فِيهَا بِإِذۡنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمۡرٖ ٤ سَلَٰمٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطۡلَعِ ٱلۡفَجۡرِ ٥

নামকরণ:

এ সূরা মাক্কী, না মাদানী তা নির্ণয়ে এবং নামকরণের ব্যাপারে আলেম সমাজের মতভেদ পাওয়া যায়। الْقَدْرِ শব্দের অর্থ হলো কদর ও মর্যাদা, মহিমান্বিত ইত্যাদি। এজন্য কদরের রাতকে ليلة القدر বলা হয়। এর কারণ এ রাত খুবই মর্যাদাপূর্ণ একটি রাত। قدر এর আরেকটি অর্থ : অনুমান ও ফায়সালা করা। এ রাতে পূর্ণ এক বছরের ফায়সালা করা হয়। এজন্য এ রাতকে ليلة الحكم বা ফায়সালার রাতও বলা হয়। এর অর্থ সংকীর্ণতাও করা হয়ে থাকে। কারণ এ রাতে এত সংখ্যক ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় যে, পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে যায়। সূরার প্রথম আয়াতে উল্লিখিত কদর শব্দ থেকেই উক্ত নামে নামকরণ করা হয়েছে।

কদরের রাত নির্ণয়:

কদরের রাত নির্ণয়ে নাবী (সাঃ) বলেন :

تَحَرَّوْا لَيْلَةَ القَدْرِ فِي الوِتْرِ، مِنَ العَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ

তোমরা রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে কদরের রাত অন্বেষণ কর। (সহীহ বুখারী হা. ২০১৭, সহীহ মুসলিম হা. ১১৬৯০)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে কদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন : কদরের রাত রমযান মাসে, অতএব তা শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে অন্বেষণ কর। যেমন ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ তারিখের রাত। (আহমাদ ২/৫১৯, বণর্নাকারী নির্ভরযোগ্য)

এছাড়া অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে যা প্রমাণ করে, কদরের রাত রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে হয়। তাই বিশেষ করে ২৭ তারিখের রাতকে কদরের রাত বলা বা সে রাতকে নির্ধারণ করে রাত্রি জাগরণ করা সঠিক নয়।

রমযানের শেষ দশকের গুরুত্ব : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সারা বছর অপেক্ষা রমযানের শেষ দশকে ইবাদতে বেশি গুরুত্ব দিতেন। আয়িশাহ (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট যখন রমযানের শেষ দশক আগমন করত তখন তিনি সারা রাত জাগতেন, পরিবারকে জাগাতেন এবং কোমরের রশিকে মজবুত করে বাঁধতেন। (সহীহ বুখারী হা. ২০২৪, সহীহ মুসলিম হা. ১১৭৪)

অন্যত্র আয়িশাহ (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রমযানে ইবাদত করার জন্য যে প্রচেষ্টা করতেন অন্য মাসগুলোতে তা করতেন না। আর রমযানের শেষ দশকে যে প্রচেষ্টা করতেন তা অন্য সময় করতেন না। (সহীহ মুসলিম হা. ১১৭৫)

কদরের রাতের ফযীলত : কদরের রাতের মাহাত্ম্য মহান আল্লাহ কুরআনেই উল্লেখ করে বলছেন যে, তা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন :

مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ

যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে নেকীর আশায় কদরের রাতে কিয়াম করবে তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (সহীহ বুখারী হা. ২০১৪, সহীহ মুসলিম হা. ৭৬০)

এ বরকতপূর্ণ রাত কেউ পেলে দু‘আ করবে :

اللّٰهُمَّ إِنَّكَ عُفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

হে আল্লাহ তা‘আলা! তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করতে ভালবাসো, অতত্রব আমাকে ক্ষমা করে দাও। (তিরমিযী হা. ৩৫১৩, সহীহ।)

তাফসীর:

আল্লাহ তা‘আলা বলছেন :

তিনি এ কুরআনকে রমযানের কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছেন। এ কদরের রাত বরকতপূর্ণ রাত যা সূরা দুখানের ৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে সূরা বাক্বারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : আল্লাহ তা‘আলা কদরের রাতে সম্পূর্ণ কুরআন এক সাথে লাওহে মাহফূজ থেকে দুনিয়ার আকাশে অবস্থিত বাইতুল ইজ্জতে নাযিল করেন। (ইবনু কাসীর)

আল্লামা সা‘দী (রহঃ) বলেন : কদরের রাতে আল্লাহ তা‘আলা কুরআন অবতীর্ণ করা শুরু করেন। (তাফসীর সাদী) অতঃপর প্রয়োজন মোতাবেক নবুওয়াতের সুদীর্ঘ ২৩ বছরে খণ্ড খণ্ড আকারে তা অবতীর্ণ হয়। তারপরের আয়াতগুলোতে কদরের রাতের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য উল্লেখ করা হয়েছে।

(لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ)

এ আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে বলা হয় যে, বানী ইসরাঈলের জনৈক ব্যক্তি ছিলেন যিনি সারা রাত নফল সালাত আদায় করতেন আর দিনের বেলা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় শত্রুর মোকাবেলায় যুদ্ধ করতেন, তিনি এরূপ হাজার মাস করেছেন। এ কথা জেনে সাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আমাদের বয়স তো মাত্র ৬০ থেকে ৭০ বছর। আমরা তো তাদের মত এত দীর্ঘ সময় ইবাদত করতে পারব না। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (ইবনু জারীর)

(خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ)

অর্থাৎ এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম।

(وَالرُّوْحُ فِيْهَا)

এখানে “রূহ” বলতে জিবরীল (রহঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ অধিক বরকতের কারণে এ রাতে জিবরীল (রহঃ)-সহ অনেক ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়।

(مِّنْ كُلِّ أَمْرٍ)

কাতাদাহ ও অন্যান্যরা বলেন: এ রাতে অনেক বিষয়ের ফায়সালা করা হয়, এবং আয়ু ও রিযিক নির্ধারণ করা হয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(فِيْهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيْمٍ)

“এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় ফয়সালা হয়।” (সূরা দুখান ৪৪ : ৪) তাফসীর মুয়াসসারে বলা হয়েছে :

من كل أمر قضاه في تلك السنة

প্রত্যেক বিষয় যা ঐ বছরের জন্য ফায়সালা করা হয় তা নিয়ে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়। (তাফসীর মুয়াসসার) আল্লামা শাওকানীও এ কথা বলেছেন।

(سَلَامٌ هِيَ) অর্থাৎ سالمة من كل أفة وشر

প্রত্যেক বিপদ ও অকল্যাণ থেকে মুক্ত। এ রাত অধিক বরকতে পূর্ণ থাকায় তাতে কোন অকল্যাণ থাকে না।

(حَتّٰي مَطْلَعِ الْفَجْرِ)

অর্থাৎ এ বরকত ও বিপদ-আপদমুক্ত পরিবেশ ফজর পর্যন্ত বহাল থাকে।

উল্লেখ্য যে, কুরআন নাযিলের এ মাসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিয়মিত জিবরীল (আঃ)-এর কাছে কুরআন পড়ে শুনাতেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : জিবরীল (আঃ) রমাযানের প্রতি রাতে আগমন করতেন এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর কাছে কুরআন তেলাওয়াত করে শুনাতেন। এ সময় নাবী (সাঃ) দানের হাত বায়ু প্রবাহের মত প্রসারিত করতেন। (সহীহ বুখারী হা. ৩২২০, সহীহ মুসলিম হা. ২৩০৮)

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ওপর কুরআন প্রতি বছর একবার করে পেশ করা হত। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর বছরে দুবার পেশ করা হয়। তিনি প্রতি বছর ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু মৃত্যুর বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফ করেন। (সহীহ বুখারী হা. ৪৯৯৮)

সুতরাং রমাযান মাস ইবাদতের অন্যতম একটি মওসুম। বিশেষ করে শেষ দশকের রাত গুলো প্রতিটি মু’মিন ব্যক্তিকে জেগে ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করা উচিত।

আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:

১. রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত বিদ্যমান, তাই বিশেষ করে ২৭ তারিখে এ রাত উদ্যাপন করা সঠিক নয়।

২. কদরের রাতের মর্যাদা জানতে পারলাম।

৩. এ রাতে আগামী এক বছরের ফায়সালা করা হয়।