Tafseer ibn Kathir

Multiple Ayahs

Tags

Download Links

Tafseer ibn Kathir tafsir for Surah Al-Hashr — Ayah 19

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَلۡتَنظُرۡ نَفۡسٞ مَّا قَدَّمَتۡ لِغَدٖۖ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرُۢ بِمَا تَعۡمَلُونَ ١٨ وَلَا تَكُونُواْ كَٱلَّذِينَ نَسُواْ ٱللَّهَ فَأَنسَىٰهُمۡ أَنفُسَهُمۡۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ١٩ لَا يَسۡتَوِيٓ أَصۡحَٰبُ ٱلنَّارِ وَأَصۡحَٰبُ ٱلۡجَنَّةِۚ أَصۡحَٰبُ ٱلۡجَنَّةِ هُمُ ٱلۡفَآئِزُونَ ٢٠

১৮-২০ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত জারীর (রাঃ) বলেনঃ “একদা সূর্য কিছু উপরে উঠার সময় আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট ছিলাম। এমন সময় উলঙ্গ দেহ ও নগ্ন পদ বিশিষ্ট কতকগুলো তোক সেখানে আগমন করলো। তারা শুধু ই’বা (আরব দেশীয় পোশাক) দ্বারা নিজেদের দেহ আবৃত করেছিল। তাদের কাঁধে তরবারী লটকানো ছিল। তাদের অধিকাংশই বরং সবাই ছিল মুযার গোত্রীয় লোক। তাদের দারিদ্র্য ও দুরবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করলেন এবং আবার বেরিয়ে আসলেন। অতঃপর তিনি হযরত বিলাল (রাঃ)-কে আযান দেয়ার নির্দেশ দিলেন। আযান হলো, ইকামত হলো এবং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) নামায পড়ালেন। তারপর তিনি খুবাহ্ শুরু, করলেন। তিনি বললেনঃ ... (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতেই সৃষ্টি করেছেন ...।” তারপর তিনি সূরায়ে হাশরের (আরবী)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। অতঃপর তিনি দান-খয়রাতের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করেন। তখন জনগণ দান-খয়রাত করতে শুরু করেন। বহু দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা), দীনার (স্বর্ণমুদ্রা), কাপড়-চোপড়, গম, খেজুর ইত্যাদি আসতে থাকে। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ভাষণ দিতেই থাকেন। এমন কি শেষ পর্যন্ত তিনি বলেনঃ “তোমরা অর্ধেক খেজুর হলেও তা নিয়ে এসো।” একজন আনসারী (রাঃ) অর্থ বোঝাই ভারী একটি থলে কষ্ট করে উঠিয়ে দিয়ে আসলেন। তারপর তো লোকদের দানের পর দান আসতেই থাকে। শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক জিনিসের এক একটি স্কুপ হয়ে যায়। এর ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর বিবর্ণ চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং সোনার মত ঝলমল করতে থাকে। তিনি বলেনঃ “যে কেউ ইসলামের কোন ভাল কাজ শুরু করবে তাকে তার নিজের কাজের প্রতিদান তো দেয়া হবেই, এমনকি তার পরে। যে কেউই ঐ কাজটি করবে, প্রত্যেকের সমপরিমাণ প্রতিদান তাকে দেয়া হবে। এবং তাদের প্রতিদানের কিছুই কম করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ শুরু করবে, তার নিজের এ কাজের গুনাহ্ তো হবেই, এমনকি তার পরে যে কেউই ঐ কাজ করবে, প্রত্যেকেরই গুনাহ তার উপর পড়বে এবং তাদের গুনাহ্ কিছুই কম করা হবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন)আয়াতে প্রথমে নির্দেশ হচ্ছেঃ আল্লাহর আযাব হতে বাঁচার ব্যবস্থা কর অর্থাৎ তাঁর হুকুম পালন করে এবং তাঁর নাফরমানী হতে দূরে থেকে তার শাস্তি হতে রক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা কর।এরপর আল্লাহ্ পাক বলেনঃ সময়ের পূর্বেই নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ কর। চিন্তা করে দেখতে থাকে যে, কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহর সামনে হাযির হবে তখন কাজে লাগার মত কতটা সঞ্চিত আমল তোমাদের কাছে রয়েছে!আবার তাগীদের সাথে বলা হচ্ছেঃ আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে থাকো এবং জেনে রেখো যে, তোমাদের আমল ও অবস্থা সম্বন্ধে তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল। না কোন ছোট কাজ তাঁর কাছে গোপন আছে, না কোন বড় কাজ তাঁর অগোচরে আছে। কোন গোপনীয় এবং কোন প্রকাশ্য কাজ তাঁর অজানা নেই।অতঃপর মহান আল্লাহ্ বলেনঃ তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা বিস্মৃত হয়েছে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করেছেন। অর্থাৎ তোমরা আল্লাহর যিকিরকে ভুলে বসো না, অন্যথায় তিনি তোমাদেরকে তোমাদের ঐ সকার্যাবলী ভুলিয়ে দিবেন যেগুলো আখিরাতে কাজে লাগবে। কেননা, প্রত্যেক আমলের প্রতিদান ঐ শ্রেণীরই হয়ে থাকে। এ জন্যেই তিনি বলেনঃ তারাই তো পাপাচারী। যেমন অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মুমিনগণ! তোমাদের ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে, যারা উদাসীন হবে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” (৬৩:৯) হযরত নাঈম ইবনে নামহাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) তাঁর এক ভাষণে বলেনঃ “তোমরা কি জান না যে, তোমরা সকাল-সন্ধ্যায় তোমাদের নির্দিষ্ট সময়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছ? সুতরাং তোমাদের উচিত যে, তোমরা তোমাদের জীবনের সময়গুলো আল্লাহর আনুগত্যের কাজে কাটিয়ে দিবে। আর এটা আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ছাড়া শুধু নিজের ক্ষমতার মাধ্যমে লাভ করা যায় না। যারা আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টির কাজ ছাড়া অন্য কাজে লেগে যাবে তোমরা তাদের মত হয়ো না। আল্লাহ তোমাদেরকে এটা হতে নিষেধ করেছেন। যেমন তিনি বলেনঃ “তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা আল্লাহকে বিস্মৃত হয়েছে, ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করেছেন।” তোমাদের পরিচিত ভাইয়েরা আজ কোথায়? তারা তাদের অতীত জীবনে যেসব আমল করেছিল তার প্রতিফল নেয়ার অথবা তার শাস্তি ভোগ করার জন্যে আল্লাহর দরবারে পৌঁছে গেছে। সেখানে তারা সৌভাগ্য লাভ করেছে অথবা হতভাগ্য হয়েছে। যেসব উদ্ধত লোক আঁকজমক পূর্ণ শহর বসিয়েছিল তারা আজ কোথায়? তারা ঐ শহরে মযবুত দূর্গসমূহ নির্মাণ করেছিল। আজ তারা কবরের গর্তে পাথরের নীচে চাপা পড়ে রয়েছে। এটা হলো আল্লাহর কিতাব কুরআন কারীম। তোমরা এর নূর হতে আলো নিয়ে নাও। এটা কিয়ামতের দিনের অন্ধকারে তোমাদের কাজে আসবে। এর সুন্দর বর্ণনা হতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর এবং সুন্দর হয়ে যাও। দেখো, আল্লাহ্ তা'আলা হযরত যাকারিয়া (আঃ) ও তাঁর পরিবারবর্গের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তারা সৎকার্যে অগ্রগামী ছিল এবং বড় লোভ ও ভয়ের সাথে আমার কাছে প্রার্থনা করতো এবং আমার সামনে ঝুঁকে পড়তো।” (২১:৯০) জেনে রেখো যে, ঐ কথা কল্যাণশূন্য যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য না হয়। ঐ মাল কল্যাণ ও বরকতপূর্ণ নয় যা আল্লাহর পথে খরচ করা হয় না। ঐ ব্যক্তি সৌভাগ্য হতে দূরে রয়েছে যার মূর্খতা সহনশীলতার উপর বিজয়ী হয়েছে। অনুরূপভাবে ঐ ব্যক্তিও পুণ্যলাভে বঞ্চিত হয়েছে যে আল্লাহর আহকাম পালনের ক্ষেত্রে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় করেছে।” (এ হাদীসটি হাফিয আবুল কাসিম তিরবানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ খুবই উত্তম এবং এর বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। যদিও এর একজন বর্ণনাকারী নাঈম ইবনে নামহাহ নামক ব্যক্তি সুপরিচিত নন, কিন্তু ইমাম আবু দাউদ সিজিস্তানী (রঃ)-এর এই ফায়সালাই যথেষ্ট যে, জারীর ইবনে উসমান (রঃ)-এর সমস্ত উস্তাদই বিশ্বাসযোগ্য এবং ইনিও তার একজন উস্তাদ)মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন জাহান্নামী ও জান্নাতীরা আল্লাহ্ তা'আলার নিকট সমান হবে না। যেমন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা পাপকার্যে লিপ্ত রয়েছে তারা কি ধারণা করেছে যে, আমি তাদেরকে ঈমান আনয়নকারী ও সৎ আমলকারীদের মত করবে? তাদের জীবিত ও মৃত কি সমান? তারা যা ফায়সালা করছে তা কতই না নিকৃষ্ট।” (৪৫:২১) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ (আরবী)অর্থাৎ “অন্ধ ও চক্ষুষ্মন সমান নয় এবং মুমিন ও সৎ আমলকারী এবং দুষ্কার্যকারী সমান নয়, তোমরা অল্পই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।” (৪০:৫৮) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে তাদেরকে কি আমি ভূ-পৃষ্ঠে বিপর্যয় সষ্টিকারীদের মত করবে অথবা আমি কি মুত্তাকীদেরকে পাপীদের মত করবে?” (৩৮:২৮) এসব আয়াত এটাই প্রমাণ করে যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা পুণ্যবানদেরকে সম্মানিত করেন এবং পাপীদেরকে লাঞ্ছিত করেন। এ জন্যেই এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ জান্নাতবাসীরাই সফলকাম। অর্থাৎ মুসলমানরা আল্লাহ তা'আলার আযাব হতে পরিত্রাণ লাভকারী।